গর্ভাবস্থার নয় মাসে শরীর প্রতিদিন বদলায়। পুরনো জামা আঁটসাঁট লাগে, পিঠে ব্যথা হয়, রাতে ঘুম আসে না, ত্বক টান টান হয়ে যায়। আর পাশাপাশি মাথায় ঘুরতে থাকে একটাই প্রশ্ন: গর্ভাবস্থায় কী কী কিনব, আর কখন? সবকিছু একসাথে কিনলে বাজেট ও জায়গা দুটোই ফুরোয়। আবার শেষ মুহূর্তে কিনতে গেলে তাড়াহুড়োয় ভুল হয়। এই গাইডে আমরা ট্রাইমেস্টার অনুযায়ী সাজিয়ে দিয়েছি কোন ধাপে কী কিনবেন, সাথে হাসপাতাল ব্যাগ ও নবজাতকের প্রস্তুতিও।
এক নজরে উত্তর: প্রথম ট্রাইমেস্টারে আরামদায়ক পোশাক ও ত্বকের যত্ন, দ্বিতীয়টিতে ম্যাটার্নিটি পোশাক, পিলো ও স্ট্রেচ মার্ক কেয়ার, তৃতীয়টিতে হাসপাতাল ব্যাগ ও নবজাতকের জিনিস কিনুন। প্রসবের পর মায়ের রিকভারির জিনিসও আগে থেকে গুছিয়ে রাখুন।
কেনাকাটার পরিকল্পনা: কোন ধাপে কী?
শুরুতে আপনার সম্ভাব্য ডেলিভারির তারিখটা জেনে নিন। এতে প্রতিটি ধাপের সময় ঠিক করা সহজ হয়। আমাদের ডিউ ডেট ক্যালকুলেটর দিয়ে এখনই হিসাব করে নিতে পারেন। গর্ভাবস্থা নিয়ে আরও জানতে পড়ুন গর্ভাবস্থা ও মাতৃত্ব গাইড।
| ধাপ | সময় | কী কিনবেন |
|---|---|---|
| প্রথম ট্রাইমেস্টার | ১–১৩ সপ্তাহ | আরামদায়ক পোশাক, ত্বকের যত্ন, চিকিৎসকের পরামর্শে ভিটামিন, বই |
| দ্বিতীয় ট্রাইমেস্টার | ১৪–২৭ সপ্তাহ | ম্যাটার্নিটি পোশাক, পিলো, বেল্ট, স্ট্রেচ মার্ক কেয়ার |
| তৃতীয় ট্রাইমেস্টার | ২৮–৪০ সপ্তাহ | হাসপাতাল ব্যাগ, নবজাতকের জিনিস, ব্রেস্টফিডিং সরঞ্জাম |
| প্রসবের পর | প্রথম ৪০ দিন | রিকভারি, প্রসব-পরবর্তী যত্ন ও পুষ্টি |
প্রথম ট্রাইমেস্টার (১ থেকে ১৩ সপ্তাহ): আরাম ও যত্ন
এই সময়ে পেট এখনো বাইরে থেকে বোঝা যায় না, কিন্তু বমি বমি ভাব, ক্লান্তি আর মেজাজের ওঠানামা শুরু হয়। তাই এ ধাপে জোর দিন আরাম ও নিজের যত্নে। বড় কেনাকাটার তাড়া নেই।
আরামদায়ক পোশাক
কোমরে চাপ দেয় এমন পোশাক এড়িয়ে ঢিলেঢালা সুতির জামা ও ইলাস্টিক কোমরের বটম বেছে নিন।
ত্বকের যত্ন
হরমোনের পরিবর্তনে ত্বক শুষ্ক, তৈলাক্ত বা সংবেদনশীল হয়ে যেতে পারে। নতুন কোনো পণ্য ব্যবহারের আগে লেবেল পড়ুন, কারণ কিছু উপাদান (যেমন রেটিনল-জাতীয়) গর্ভাবস্থায় এড়ানোই ভালো।
- মম স্কিনকেয়ার
- ফেসিয়াল স্কিনকেয়ার
- ময়েশ্চারাইজার ও সিরাম
- আই, লিপ ও সানকেয়ার
- ফেস ও বডি অয়েল
- হাত ও পায়ের যত্ন
পুষ্টি ও ওয়েলনেস
গুরুত্বপূর্ণ: ভিটামিন, আয়রন বা কোনো সাপ্লিমেন্ট নিজে থেকে শুরু করবেন না। প্রয়োজন ও ডোজ চিকিৎসক ঠিক করে দেবেন।
দ্বিতীয় ট্রাইমেস্টার (১৪ থেকে ২৭ সপ্তাহ): কেনাকাটার সেরা সময়
সকালের অসুস্থতা কমে আসে, শক্তি ফেরে, আর পেট স্পষ্ট হতে শুরু করে। তাই এটাই কেনাকাটার সবচেয়ে ভালো সময়।
ম্যাটার্নিটি পোশাক
২ থেকে ৩ সেট ভালো মানের পোশাকই যথেষ্ট। এমন কাপড় নিন যা ধোয়ার পরও আকার ঠিক রাখে এবং প্রসবের পর বুকের দুধ খাওয়ানোর সময়ও কাজে লাগে।
ঘুম ও পিঠের আরাম
পেট বড় হলে আরাম করে ঘুমানো কঠিন হয়ে যায়। ম্যাটার্নিটি পিলো পেট, কোমর ও পায়ের নিচে সাপোর্ট দেয়। ম্যাটার্নিটি বেল্ট পিঠ ও কোমরের চাপ কমাতে সাহায্য করে। তবে বেল্ট ব্যবহারের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
স্ট্রেচ মার্ক ও ত্বকের যত্ন
পেট, উরু ও বুকের ত্বক টান পড়ে বলে স্ট্রেচ মার্ক হতে পারে। শুরু থেকেই নিয়মিত ময়েশ্চারাইজ করলে ত্বক নরম ও আর্দ্র থাকে।
বাইরে যাওয়ার ব্যাগ
তৃতীয় ট্রাইমেস্টার (২৮ থেকে ৪০ সপ্তাহ): ডেলিভারির প্রস্তুতি
এই ধাপে চলাফেরা ধীর হয়ে আসে, আর যেকোনো সময় ডেলিভারি হয়ে যেতে পারে। তাই ৩২ থেকে ৩৬ সপ্তাহের মধ্যে হাসপাতাল ব্যাগ গুছিয়ে ফেলুন এবং নবজাতকের জরুরি জিনিস কিনে রাখুন। অকালপ্রসবের সম্ভাবনা থাকলে চিকিৎসকের সাথে কথা বলে আরও আগে প্রস্তুতি নিন।
হাসপাতাল ব্যাগ চেকলিস্ট
দুটি আলাদা ব্যাগ গুছিয়ে রাখুন, একটি মায়ের জন্য, একটি নবজাতকের জন্য। ব্যাগ দুটি একসাথে দরজার কাছে রাখুন যেন জরুরি সময়ে শুধু তুলে নিলেই হয়।
মায়ের জন্য
নবজাতকের জন্য
কাগজপত্র ও অন্যান্য
- গর্ভাবস্থার রিপোর্ট ও প্রেসক্রিপশন
- জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি ও প্রয়োজনীয় তথ্য
- মোবাইল, চার্জার ও পাওয়ার ব্যাংক
- কিছু নগদ টাকা ও কার্ড
- হালকা শুকনো খাবার ও পানি
নবজাতকের জন্য কেনাকাটা
নবজাতকের জন্য সবকিছু একসাথে কেনার দরকার নেই। প্রথম কয়েক সপ্তাহের জরুরি জিনিসগুলো আগে কিনুন, বাকিগুলো পরে বাচ্চার প্রয়োজন বুঝে। আমাদের বেবি শপিং চেকলিস্ট টুল দিয়ে নিজের তালিকা বানিয়ে নিতে পারেন।
ঘুম ও বিছানা
গোসল, ত্বক ও গ্রুমিং
- বেবি বাথ টাব
- বেবি বডি ওয়াশ
- বেবি লোশন
- Sebamed Baby Extra Soft Cream ২০০ মি.লি.
- বেবি গ্রুমিং কিট
- হুডেড তোয়ালে
ডায়াপারিং
স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা
বেবি গিয়ার ও বাইরে যাওয়ার সরঞ্জাম
হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরা থেকে শুরু করে ডাক্তার দেখানো, সবকিছুর জন্য বাচ্চাকে নিরাপদে বহন করার ব্যবস্থা দরকার। দেখুন আমাদের বেবি গিয়ার ও হোম ও ট্রাভেল কালেকশন।
বুকের দুধ খাওয়ানোর প্রস্তুতি
বুকের দুধ শিশুর জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত খাবার। খাওয়ানো সহজ ও আরামদায়ক করতে আগে থেকেই কিছু সরঞ্জাম গুছিয়ে রাখুন। কর্মজীবী মা হলে পাম্প ও স্টোরেজের ব্যবস্থা আরও জরুরি।
- ব্রেস্টফিডিং
- ব্রেস্টফিডিং অ্যাক্সেসরিজ
- ম্যানুয়াল ব্রেস্ট পাম্প
- ইলেকট্রিক ব্রেস্ট পাম্প
- মিল্ক স্টোরেজ ও কুলার ব্যাগ
- বার্প ক্লথ
প্রয়োজনে বোতলে খাওয়ানোর জন্য ফিডিং বোতল, স্টেরিলাইজার ও ইনফ্যান্ট ফর্মুলা দেখতে পারেন। তবে ফর্মুলা বা বোতল ব্যবহারের সিদ্ধান্ত চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে নিন।
প্রসবের পর ৪০ দিন: মায়ের রিকভারির প্রস্তুতি
অনেক মা শুধু বাচ্চার জিনিস গুছিয়ে নিজের প্রস্তুতি ভুলে যান। অথচ প্রসবের পর প্রথম কয়েক সপ্তাহ মায়ের বিশ্রাম, পুষ্টি ও যত্ন সবচেয়ে বেশি দরকার।
- প্রসব-পরবর্তী যত্ন
- প্রসব-পরবর্তী ওয়েলনেস পণ্য
- রিকভারি এসেনশিয়ালস
- পার্সোনাল কেয়ার
- স্ট্রেচ মার্ক কেয়ার
- নিউট্রিশন ও ওয়েলনেস
চিকিৎসকের পরামর্শ নিন: প্রসবের পর ভিটামিন, ওজন কমানোর পণ্য বা জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি শুরুর আগে অবশ্যই চিকিৎসকের সাথে কথা বলুন। প্রয়োজন হলে মম ভিটামিন ও সাপ্লিমেন্ট, ওয়েট ম্যানেজমেন্ট ও ফ্যামিলি প্ল্যানিং ক্যাটাগরি দেখে নিতে পারেন।
বই ও মানসিক প্রস্তুতি
মা হওয়ার প্রস্তুতি শুধু জিনিসপত্রের নয়, মনেরও। ভালো বই পড়লে অনেক ভয় ও দ্বিধা কেটে যায়, আর নতুন দায়িত্বের জন্য আত্মবিশ্বাস বাড়ে।
- প্রেগনেন্সি বই
- মাদারহুড বই
- ম্যাটারনাল ওয়েলনেস
- পোস্টপার্টাম বই
- মা ও শিশুর যত্ন
- নবজাতকের যত্নের বই
- পজিটিভ প্যারেন্টিং
- গুড প্যারেন্টিং
অনেক পরিবার গর্ভাবস্থায় কুরআন তিলাওয়াত ও দোয়ায় সময় কাটান। সেজন্য দেখতে পারেন কুরআন ও কুরআন শিক্ষা এবং দোয়া ও আযকার। সন্তানের জন্য সুন্দর নাম খুঁজতে ব্যবহার করুন বেবি নেম ফাইন্ডার। আর ইসলামিক দৃষ্টিকোণ থেকে সন্তান লালন-পালন নিয়ে জানতে পড়ুন ইসলামী প্যারেন্টিং গাইড।
গর্ভবতী মাকে কী উপহার দেবেন?
স্ত্রী, বোন বা বান্ধবীর জন্য উপহার খুঁজছেন? এমন কিছু দিন যা তাঁর এই সময়ে সত্যিই কাজে লাগবে:
- ম্যাটার্নিটি পিলো
- মম স্কিনকেয়ার সেট
- স্ট্রেচ মার্ক কেয়ার
- টোট ব্যাগ
- ম্যাটার্নিটি পোশাক
- প্রেগনেন্সি বই
- নিউবর্ন কেয়ার কিট (বাচ্চার জন্য)
উপহার কেনা নিয়ে কোনো প্রশ্ন থাকলে আমাদের হেল্প সেন্টার বা যোগাযোগ পেজে জানাতে পারেন।
৫টি সাধারণ ভুল, যা এড়িয়ে চলবেন
- সবকিছু একসাথে কেনা। বাজেট ও জায়গা দুটোই নষ্ট হয়। ধাপে ধাপে কিনুন।
- অতিরিক্ত ম্যাটার্নিটি পোশাক কেনা। ২ থেকে ৩ সেটই যথেষ্ট, কারণ এগুলো কয়েক মাসের জন্য পরবেন।
- নবজাতকের জামা বেশি সাইজে কেনা। বাচ্চা দ্রুত বড় হয়, তাই শুরুতে অল্প করে কিনুন।
- চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া সাপ্লিমেন্ট বা ক্রিম ব্যবহার। গর্ভাবস্থায় সব পণ্য সবার জন্য উপযোগী নয়।
- হাসপাতাল ব্যাগ শেষ মুহূর্তে গোছানো। ৩২ থেকে ৩৬ সপ্তাহের মধ্যেই তৈরি রাখুন।
সব এক নজরে: কোন প্রয়োজনে কোথায় দেখবেন
- মম কেয়ার
- ম্যাটার্নিটি ও প্রেগনেন্সি
- প্রসব-পরবর্তী যত্ন
- মম স্কিনকেয়ার
- মম হেলথকেয়ার
- মম ব্যাগ
- নিউবর্ন ও নার্সারি
- বেবি ফিডিং
- বাথ ও স্কিন
- ডায়াপারিং ও পটি
- হেলথ ও সেফটি
- বেবি গিয়ার
- জামা ও জুতা
- হোম ও ট্রাভেল
- প্যারেন্টিং বই
- ইসলামিক বই
আরও পড়ুন ও কাজের টুল
- গর্ভাবস্থা ও মাতৃত্ব
- নবজাতকের যত্ন
- প্যারেন্টিং গাইড
- ডিউ ডেট ক্যালকুলেটর
- বেবি শপিং চেকলিস্ট
- বেবি নেম ফাইন্ডার
- প্যারেন্টিং কুইজ
- ডেলিভারি ও শিপিং
- রিটার্ন ও রিফান্ড
সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)
গর্ভাবস্থায় কেনাকাটা কখন শুরু করা উচিত?
প্রথম ট্রাইমেস্টারে শুধু আরামদায়ক পোশাক ও ত্বকের যত্নের জিনিস কিনুন। বড় কেনাকাটা, যেমন ম্যাটার্নিটি পোশাক ও পিলো, দ্বিতীয় ট্রাইমেস্টারে করা সবচেয়ে সুবিধাজনক। আর নবজাতকের জিনিস ও হাসপাতাল ব্যাগ ৩২ থেকে ৩৬ সপ্তাহের মধ্যে গুছিয়ে ফেলুন।
হাসপাতাল ব্যাগ কখন গোছানো উচিত?
সাধারণত ৩২ থেকে ৩৬ সপ্তাহের মধ্যে গোছানো ভালো। অকালপ্রসবের ঝুঁকি থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে আরও আগে প্রস্তুতি নিন।
ম্যাটার্নিটি পোশাক কতগুলো কেনা দরকার?
২ থেকে ৩ সেট ভালো মানের সুতির পোশাকই সাধারণত যথেষ্ট। এমন কাপড় নিন যা আরামদায়ক ও সহজে ধোয়া যায়, আর প্রসবের পর বুকের দুধ খাওয়ানোর সময়ও কাজে লাগে।
ম্যাটার্নিটি পিলো কি সত্যিই দরকার?
বাধ্যতামূলক নয়, তবে পেট বড় হলে পাশ ফিরে আরাম করে ঘুমাতে এটি অনেকের কাজে আসে। পেট, কোমর ও পায়ের নিচে সাপোর্ট পাওয়া যায়। ঘুমের সঠিক ভঙ্গি নিয়ে সন্দেহ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
গর্ভাবস্থা থেকে নবজাতকের সব প্রস্তুতি এক জায়গায় পেতে চান?
মম কেয়ার কালেকশন দেখুনবি.দ্র.: এই লেখাটি সাধারণ তথ্যের জন্য, চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়। গর্ভাবস্থা, ভিটামিন, সাপ্লিমেন্ট বা প্রসব-পরবর্তী যত্নের ক্ষেত্রে অবশ্যই আপনার চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।